Tuesday , 19 October 2021
Home / খবর / লোকগানের ধ্রুবতারা লাভলী দেব – Binodonnews24

লোকগানের ধ্রুবতারা লাভলী দেব – Binodonnews24


দেশের যে ক’জন শিল্পী সঠিক কথা ও সুরে লোকগান পরিবেশন করে যাচ্ছেন লাভলী দেব তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রান্তে অবস্থান করলেও মোহনীয় কণ্ঠ যাদু তাঁকে এনে দিয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। লোকগানের মরমী শিল্পী হিসেবে শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বজুরেই রয়েছে তাঁর পরিচিতি। দূর প্রবাসে বাঙালি অধ্যুষিত প্রতিটি স্থানেই স্বনামে খ্যাত তিনি।

লোকগানের প্রসঙ্গ এলে অবধারিতভাবেই এখন উচ্চারিত হয় লাভলী দেবের নাম। কেউ তাঁকে গানকন্যা, কেউবা গানের পাখি, আবার কেউ কেউ তাঁকে কুকিলকণ্ঠি শিল্পীর অভিধায় আখ্যায়িত করে থাকেন। কণ্ঠযাদুর কল্যাণে তিনি জয় করেছেন অগণন গানপ্রিয় মানুষের মন। তাঁর সারল্যভরা কন্ঠে ভাটি-বাংলার লোকগান যেভাবে মোহনীয়তা ছড়ায় তা এক কথায় অনন্য। সংগীতবোদ্ধামাত্রেই এ কথা স্বীকার করেন যে, লোকগানকে জনপ্রিয় করতে বর্তমানে যাঁরা গুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন তাদের মধ্যে তিনি শীর্ষস্থানীয়। তিনযুগের গানযাত্রায় অফুরান মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসাই শুধু পাননি পেয়েছেন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সকল সংগীতগুনীর সান্নিধ্য। বাউল শাহ আবদুল করিম, বিদিতলাল দাস, রামকানাই দাশ, বাউল ক্বারী আমির উদ্দিন, হিমাংশু গোস্বামী, হিমাংশু বিশ্বাস, রুহি ঠাকুর, চন্দ্রাবতী রায় বর্মন প্রমুখের স্নেহের পরশ তাঁর চলার পথকে করেছে মসৃণ।

এ অঞ্চলের জনপ্রিয় শিল্পীদের তালিকায় তিনি শুধু শীর্ষেই নন, বলা চলে অদ্বিতীয়। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর কোনও অহমিকা নেই। সারল্যভরা জীবনের মতোই স্বাভাবিকতায় তিনি প্রবহমান রেখেছেন গানযাত্রার গতিপথ।

আরাধনায় আগমন, সংগীতের প্রথম পাঠ!
আগমনী শব্দটা দুর্গোপুজোর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়েছে যে, এই শব্দটা বললে পুজো সমাগত তা বোঝাতে আর কোনও শব্দ প্রয়োগের প্রয়োজন পরেনা। এই শব্দটি লাভলী দেবের জীবনের সঙ্গেও মিশে একাকার হয়ে গেছে। আগমনীতে আগমন তাঁর জীবনকে করেছে ছন্দময়!

সত্তরের অসহযোগ আন্দোলন তখন তুঙ্গে। স্বাধিকারের দাবিতে মুক্তিকামী মানুষ রাজপথে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও সেবার পাকি অসুর বিতারণের প্রত্যয়ে করছিলেন ত্রিনয়নীর আরাধনা। সেই দুসহ সময়ে মহানবমীর মহেন্দ্রক্ষণে যখন আরতিতে মত্ত পূণ্যার্র্থীরা, ঢাকের তালের সঙ্গে চলছে দুর্গা মায়ের বন্ধনা, ধূপ আর আগরের গন্ধে মোহিত চারদিক ঠিক এমনই এক মুহুর্তে সবুজে ঘেরা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির আবেশ জড়ানো গৃহে জন্ম হয় লাভলী দেবের। ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংগীতময়তার সেই আবেশ তাঁকে আচ্ছাদিত করে। কানে পৌছে তাল লয়ের অপূর্ব সংমিশ্রণ। প্রথম কান্না যেন খোঁজে পায় সুর-বাদ্যের সমন্বয়। তাই অ আ ক খ শিখার আগেই তিনি রপ্ত করে ফেলেন সারেগামাপায়ের স্বরলিপি! অবশ্য এটা সম্ভব হয়েছে পারিবারিক আবহের কারণে এবং রক্তে গানের আবহ থাকায়।

বাবা শৈলেন্দ্র চন্দ্র রায় ছিলেন গানের মানুষ। সংগীত অন্তপ্রাণ বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তা-ই। তাঁর একটি গানের দল ছিল। নিজে গাইতে না পারলেও খুব ভালো সংগত দিতে পারতেন। মৃদঙ্গ এবং হারামোনিয়াম বাজানোয় তাঁর দক্ষতা ছিলো ঈর্ষণীয়। ধর্মপ্রাণ দেব বাড়িতে নিয়মিত সন্ধ্যা আরতি হতো। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আরতিকে আনন্দময় করে তুলতেন শৈলেন্দ্র চন্দ্র রায়। বিশেষ করে আরতিতে নারীদের উপস্থিতি ছিলো অপরিহার্য্য। মঙ্গল আরতিতে ছোট্ট লাভলী দেব যখন ‘ভব সাগর তারণ কারণ হে…গুরুদেব দয়া কর দ্বীন জনে।’ বলে দোহার দিতেন তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকতেন সবাই। এই আবিষ্টতাই জন্মদাতাকে আগ্রহী করে তোলে তাঁকে গান শেখানোর প্রতি। শৈলেন্দ্র চন্দ্র রায় নিজেই অবতীর্ন হন সংগীত শিক্ষকের ভূমিকায়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভক্তিমূলক গানের প্রতি তিনি বিশেষভাবে অনুরক্ত থাকায় সেই গানগুলোই মেয়েকে শেখাতে শুরু করেন। পিতার নিবিড় পরিচর্যায় সংগীতের প্রথম পাঠ ভালোভাবেই গ্রহন করেন লাভলী দেব। রপ্ত করেন অনেক কলা কৈশল।

আরাধনা দিয়ে সংগীত সাধনা শুরু করায় এ ধারার গীতই আরাধ্য হয়ে উঠে লাভলী দেবের। সেই যাত্রাকে সহজ করতে নতুন গানের মাষ্টার রাখা হয় তার জন্য। বাগানের সংগীত শিক্ষক সত্যবাবুর উপর ন্যস্ত হয় লাভলী দেবকে গান শেখানোর দায়িত্ব। প্রতি সপ্তাহে একদিন আসতেন তিনি। খুব যত্ন করে শেখাতেন স্বরলিপির পাঠ! একদিকে সংগীত শিক্ষা অন্যদিকে লেখাপড়া, দুটোই চলতে থাকে সমানতালে। মেয়ের আগ্রহ আর অধ্যবসায়ে আশাবাদী হয়ে ওঠেন শৈলেন্দ্র চন্দ্র রায়। লাভলীকে স্বপ্ন দেখান দূরের পথ পারি দেবার। সেই উদ্দেশ্য থেকেই হবিগঞ্জে সুরবিতান সংগীত বিদ্যালয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ওস্তাদ বাবর আলী খান ছিলেন তাঁর বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সংগীত প্রশিক্ষক হিসেবে তাঁর দক্ষতা ছিলো তুলাহীন। উল্লেখ করা আবশ্যক যে, তাঁর কাছ থেকেই সংগীতের প্রথম পাঠ গ্রহণ করেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী সুবির নন্দী। এমন ওস্তাদকে পেয়ে লাভলী দেবও উজ্জীবিত হয়ে উঠেন। গভীর মনোযোগীন হন তিনি গান শেখার প্রতি। সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মূলত লাভলী দেব সেখান থেকেই গ্রহন করেন। প্রখ্যাত সেই সংগীতজ্ঞের শিক্ষাই মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করায় তাঁকে। তাঁর কাছ থেকে ক্ল্যাসিকেলের যে গভীর পাঠ তিনি গ্রহন করেছিলেন সেটাই তাঁকে অনন্য করে তোলে।

১৯৮১ সালে উপজেলা পর্যায় থেকে জাতীয় শিশু প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পেছনেও ছিলো বাবর আলী খানের ভূমিকা। পর পর দুইবার জয়ী হন তিনি। প্রতিযোগিতায় লালনগীতিতে তাঁর উপস্থাপনা এতটাই ভালো হয়েছিলো যে, আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন বিচারকরা। দেশজুড়েই তখন আলোচিত হয় লাভলী দেবের সাফল্যগাঁথা। যে গান গেয়ে প্রথমবার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন তিনি সেই গান গাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে নাটকিয়তা। প্রতিযোগিতায় যে গানটি গাওয়ার জন্য মনস্থির করেছিলেন তিনি তা পাল্টে যায় ঢাকায় যাবার পথে। তেলিয়াপাড়া এলাকায় কিছু সময়ের জন্য তাদের বহনকারী বাসটি থামলে এক ভিক্ষুক বাসে উঠে গান ধরেন, ‘ও যার আপন খবর আপনার হয়না।’ গানটি শোনেই বাবার কাছে বায়না ধরেন সেটি লিখে দিতে। ঢাকায় পৌছে বার কয়েক প্র্যাকটিস করে সিদ্ধান্ত নেন এটিই গাইবেন চূড়ান্ত পর্বে। গাইলেন এবং জয়ী হলেন। এই ঘটনাটি পরিবর্তন আনে তাঁর গানযাত্রায়। নজরুল সংগীতের শিল্পীর অভিনিবেশ ঘটে লোকগানে।

এসএসসি পাশের পর তিনি লাভলী দেব চলে আসেন শ্রীমঙ্গলে বড় ভাইয়ের বাসায়। ভর্তি হন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে। চায়ের রাজধানীতে থেকেই চলতে থাকে সংগীতচর্চা আর পড়ালেখা। সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে শ্রীমঙ্গলের অগ্রগামিতা তাঁর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সে সময় শ্রীমঙ্গলের বিশেষ প্রতিটি অনুষ্ঠানেই ডাক পরতো লাভলী দেবের। এই পর্যায়ে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের তালিকাভূক্ত শিল্পী হিসেবে নিবন্ধিত হন তিনি। শ্রীমঙ্গল থেকে রেডিওতে অডিশন দিয়ে প্রথমবারেই সুযোগ পেয়ে যান লালনগীতিতে। সময় প্রবাহে আজ লোকগানের অপরিহার্য শিল্পী হিসেবে অর্জন করেছেন তিনি খ্যাতি। এ প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য-‘লোকগানে ঠিক যে রস ও মধু আছে সেটা আমি অন্তত গানের অন্যকোনও শাখায় তা খুঁজে পাইনা। করিম ভাই বলেছিলেন না, মন মজালে ওরে বাউলা গান। আমারও তেমনই লোকগানেই মন মজেছে।’

গানযাত্রায় ছন্দপতন!
সংগীতময়তা আর লেখাপড়া-দুয়ের সমন্বয় যখন লাভলী দেবকে অগ্রগামি করছিলো তখনই তাঁর গানযাত্রায় ছন্দপতন ঘটে। বিশেষ কোনও ঘটনায় নয়, পরিণয়ই তৈরি করে প্রতিবন্ধকতা। রেডিওতে গান গাওয়ার বদৌলতে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা দীপক দেবের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় লাভলী দেবের। ১৯৮৯ সালে তিনি এই পরিচয়কে আত্মীয়তার বন্ধনে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নিলেন। লোকগানের আরেক শিল্পী জামাল উদ্দিন হাসান বান্নাকে সঙ্গে নিয়ে বড় ভাই দীপক দেবের জীবনসঙ্গীনি করলেন লাভলী দেবকে। শহরতলীর করেরপাড়ার দেব পরিবারের বড় বউ হওয়ায় পরিবার পরিচালনার পুরো দায়িত্বই বর্তায় তাঁর ওপর। নব্বই সালে প্রথম সন্তানের জন্ম, এর আড়াই বছর পর দ্বিতীয় সন্তানের আগমন পুরোপুরি পরিবারমুখি করে তোলে লাভলী দেবকে। শ্বশুড়-শ্বাশুড়িসহ পরিবারের সকল সদস্যদের কাছে তিনি হয়ে উঠেন অনন্যা। গান চলে যায় নির্বাসনে! কিন্তু কাকতালীয় একটি ঘটনা তাঁকে পুণরায় গানের ভূবনে ফিরিয়ে আনতে পালন করে অনুঘটকের ভূমিকা।

’৯৬ সালে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার দায়িত্ব বর্তায় দীপক দেবের ওপর। অনুষ্ঠানের জন্য কোনও শিল্পী না পেয়ে যখন তিনি প্রায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখনই একজন সহকর্মী লাভলী দেবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বৌদিকে দিয়ে গান করালেইতো সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।’ নিজের ঘরে শিল্পী থাকতে বাইরে শিল্পী খুঁজছি ভেবে নিজেই একটু লজ্জ্বা পেয়ে যান দীপক দেব। বাসায় ফিরে লাভলী দেবের কাছে সমস্যাটি তুলে ধরতেই অভয় দেন তিনি, ‘চিন্তা করওনা আশাকরি লজ্জ্বা পাবেনা।’ সেদিন প্রধান শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন লাভলী দেব। তাঁর গাওয়া লালনগীতি ও লোকসংগীত স্রোতাদের আনন্দে উদ্বেলিত করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদও ভূয়সি প্রশংসা করেন তাঁর গানের। মেডিক্যাল সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এক নামে পরিচিত হয়ে উঠেন তিনি। দীর্ঘ আট বছর পর এমন প্রত্যাবর্তন লাভলী দেব নিজেও প্রত্যাশা করেন নি।

মাতৃস্নেহে ফিরে আসা!
লাভলী দেবের এমন উপস্থাপনায় দীপক দেব মনে মনে আনন্দে আত্মহারা হলেও এনিয়ে অনেকটাই নির্বিকার থাকেন। কারন সংগীতাঙ্গিকের কারনে আট বছরের সংসার জীবনে একদিনও লাভলী দেবের গাওয়া গান শোনেন নি দীপক দেব। তবে তাঁর গানের প্রতি গভীর অনুরক্ত ছিলেন শ্বাশুড়ি পারুল বালা দেব। তিনি তাঁকে নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই গান শোনতে বসতেন। আধুনিক এবং হিন্দি গানের ভক্ত দীপক দেব লোকগান ভালো লাগতো না বলে বউ-শ্বাশুড়ির আসরের ধারে কাছেও যেতেন না।

ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের গানের অনুষ্ঠানের কথা লাভলী দেবের কাছ থেকেই অবগত হয়েছিলেন পারুল বালা। গর্বে তাঁর বুক ভরে উঠেছিলো। বউমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ পারুল বালা সেদিন লাভলী দেবের মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘মা-রে দেখে নিস গানই তোকে অনেক বড় করবে একদিন। তাই গানটা চালিয়ে যেতে হবে তোকে।’ শ্বাশুড়ির এম কথা শুনে সেদিন লাভলী প্রশ্ন করছিলেন সেটা কি সম্ভব মা? তাঁর এই প্রশ্নের সমাধান দিতে কালবিলম্ব করেন নি পারুল বালা। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দীপক দেবকে ডেকে আনেন। বলেন, ‘বাবা তোমারে একটা কথা জিগাইতাম, তুমি কিন্তু ঠিক ঠিক উত্তর দিবায়।’ সম্মতিসূচক মাথা নাড়াতেই তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তুমিতো ওসমানী মেডিক্যালের কর্মকর্তা, সেখানে ফাস্টক্লাস গেজেটেড অফিসারের অভাব নেই।’ হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন দীপক দেব। ‘কওছাইন দেখি, ক’জন শিল্পী আছে বৌমার মতো যারা গান গাইতে পারে মেডিক্যাল কোয়ার্টারে?’ চিন্তায় পরে যান দীপক দেব। কোনও উত্তর দিতে পারেন নি। মা বললেন, ‘শোনও বাবা। গান ঈশ্বরের দান। সবার কন্ঠে কিন্তু ঈশ্বর গান দেন না। বৌমাকে যেহেতু দিয়েছেন তুমি তার গানযাত্রারও সহযাত্রী হও। তোমার কিচ্ছু করা লাগতো নায়, তুমি খালি তার লগখানো থাইক্কো।’ মাতৃভক্ত দীপক জন্মাদাত্রীকে কথা দেন, সঙ্গে থাকবেন বলে। সেই থেকে দিন নেই, রাত নেই লাভলী দেবকে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছেন দীপক দেব। অক্ষরে অক্ষরে তিনি পালন করে চলেছেন মাতৃআজ্ঞা।

এখানেই দায়িত্ব শেষ করেন নি পারুল বালা। প্রতিসপ্তাহে একদিন নিম্বার্ক আশ্রমে গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন লাভলী দেবকে। অধ্যক্ষ কৃষ্ণকুমার পাল চৌধুরী ব্যাখাসহ পাঠ করতেন গীতা। পাঠ শেষে হতো ভক্তিমূলক গান, কীর্ত্তন। পারুল বালা দেবই কৃষ্ণকুমার পাল চৌধুরীসহ অন্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বৌকে এবং তাদের অবগত করেন, ‘আমার বৌমা ভক্তিমূলক গান খুব ভালো গায়।’ লাভলী দেব নিজের এমন প্রশংসায় অসস্থিবোধ থেকে শ্বাশুড়িকে নিবৃত করার চেষ্টা করতেন কিন্তু তাতে কোনও কাজ হতো না। একদিন পাঠ শেষে কৃষ্ণকুমাল পাল চৌধুরী লাভলী দেবকে গান গাইতে বললেন। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লাভলী দেব বলেন, ‘আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মা আমাকে বললেন, ‘ভগবান সুর দিছইন ভক্তরে খুশি করার লাগি। ভক্তরে খুশি করলে ভগবান খুশি অইবা। আমি বিষয়টি সেভাবে কখনও চিন্তা করিনি। মাথায় এলো তাইতো। সেদিনই সকল সঙ্কুচ উবে গেল। গাইলাম ভক্তিমূলক কয়েকটি গান। কে কে পাল স্যার বুক ভরে আশির্বাদ করলেন আমার জন্য। এরপর থেকে শুরু করলাম নতুন করে সংগীত চর্চা। নিয়মিত গাইতে থাকলাম নিম্বার্ক আশ্রমে। সে সঙ্গে রেডিওতে চলতে থাকলো প্রোগ্রাম।’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সর্বমহলে পরিচিতি এলো লাভলী দেবের। শুধু সিলেট জেলাতেই নয়, সমগ্র বিভাগে এবং একসময় সারাদেশেই পরিচিতি পেলেন তিনি। সঙ্গীকে সঙ্গ দিতে দিতে কখনযে দীপক দেব নিজেও প্রেমে পড়ে গেলেন লোকগানের, টেরই পাননি। এখন লোকগানের কথা ও সুর যতটা তাঁর মনে ঠিক যতটা ঢেউ তুলে অন্যকোনও গানে সেটা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে তাঁর সহজ-সাবলীল উত্তর, ‘লোকগানেইতো আসল রস। ডুবে থাকা যায়। সংগীতের অন্যকোনও ধারা থেকে তা আস্বাদন করা যায়না।’

প্রেরণার উৎসে বড় মা
মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত তাঁর জন্মদাত্রীকে অর্ধমৃত করে রাখায় যে সময়টায় মায়ের ভালোবাসার পাওয়ার কথা তা পাননি লাভলী দেব! যুদ্ধে গিয়ে মামা দূর্গাপদ দত্ত ফিরে না আসার যাতনা সইতে না পেরে সেইযে শয্যাশায়ি হন স্মৃতিকণা রায়, তা কাটিয়ে উঠতে লেগেছিলো কয়েক বছর। সে কারনে সন্তানদের প্রতি তাঁর কোনও খেয়াল ছিলো না। নাওয়া-খাওয়ায়ও ছিলো না আগ্রহ। শক্ত হাতে শৈলেন্দ্র রায় সেই পরিস্থিতি শামাল দিয়েছিলেন এবং স্মৃতিকণাকে সেই পরিস্থিতি থেকে বের করে এনে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন নতুন করে বাঁচার। এই পরিস্থিতি থেকে লাভলীর শিশুমনকে দৃঢ়চেতা করতে যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি তাঁর বড় মা ক্ষিরদা সুন্দরী রায়। শেষ পর্যন্ত লেগে থাকার যে প্রত্যয় সেটা তাঁর কাছ থেকেই রপ্ত করেছেন লাভলী। স্বদেশি আন্দোলনের জেলখাটা নেত্রী ক্ষিরদা সুন্দরীর ব্যক্তিত্বের প্রভাব রয়েছে তাঁর জীবন জুড়ে। বড়মার কাছ থেকেই তিনি দীক্ষিত হয়েছেন অগ্নিমন্ত্রে, আর গ্রহন করেছেন জীবনবোধের নিবিড় পাঠ। অসম্ভব মেধাবী বড়মা তাঁকে প্রায়শই বলতেন, ‘দেশমাতৃকা সবার উপরে। তারপর অন্যসব। দেশকে ভালোবাসতে হবে মায়ের মতোই।’ এই দীক্ষাকেই করেছেন তিনি চলার পথের পাথেয়।

গানের খোঁজে…
আমাদের লোকগানের ভাণ্ডার অফুরান। গ্রাম-বাংলায় ঠিক কত লোকগান ছড়িয়ে আছে, তার হিসেব আমরা জানিনা। গ্রন্থভূক্ত বা রেকর্ড না হওয়ায় অতীতে হারিয়ে গেছে অনেক গান। তারমধ্য থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু গান সংরক্ষন করার পরিকল্পনা করলেন লাভলী দেব। কিন্তু সে সময়টায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো এত উন্নত না থাকায় তাঁর গান সংগ্রহের যাত্রা মোটেই সহজ ছিলনা। তবে, ইচ্ছে পুরণে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। সে কারনে ছুটে গেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। এমনকি ট্রেনের ভিক্ষুকদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করেছেন গান। তাদের সঙ্গে ট্রেনের মধ্যে কথা বলতে বলতে কখনও পৌছে গেছেন শায়েস্তাগঞ্জ, কখনওবা ব্রাহ্মনবাড়িয়া। যেখানেই গিয়েছেন ফিরে এসেছেন গান নিয়ে, হাসিমুখে। তাঁর গানের এমন নেশাকে হাসি মুখেই মেনে নিতেন পরিবারের সদদ্যরা। মা-বাবা, ভাই-বোন যোগাতেন প্রেরণা। পারিবারিক এই উদার দৃষ্টিভঙ্গিই লাভলী দেবের চলার পথকে করেছে মসৃণ। স্বপ্নগুলো হয়েছে স্বার্থক।

শুধু গান সংগ্রহ-ই নয় কিছুকাল তিনি শিক্ষকতাও করেছেন গানের। সিলেটের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, বিবিআইএস এবং স্কলার্স হোম স্কুলে সপ্তাহে একদিন করে গানের ক্লাস নিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। কিন্তু শিক্ষকতা সুরসাধনার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ানোর কারনে পাঠদানের পাঠ চুটিয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন সংগীত সাধনায়। এ প্রসঙ্গে তাঁর সহজ-সরল উক্তি- ‘সত্যি বলতে কি, আমি নিজেই এখনো পুরোপুরি শিখতে পারিনি, সেই আমি কি শেখাবো? সংগীতে আসলে শেখার শেষ নেই। আমি প্রতিদিনই শিখি, শিখছি। তবে গভীর মনোনিবেশ ছাড়া এবং প্রাত্যহিক চর্চা ছাড়া আর সবই হওয়া যায়; কিন্তু ভালো শিল্পী হওয়া কঠিন। শিল্পী হতে গেলে নিবিড় সাধনার প্রয়োজন। সেই পথেই প্রবহমান রেখেছি নিজেকে।’

আরাধনা
লাভলী দেবের কাছে সংগীত কেবল গান গাওয়া নয়। সংগীত তাঁর কাছে ‘আরাধনা।’ সুর সাধনাকে তিনি অসীমের সঙ্গে একাকার হওয়ার সাধনার অন্যতম অনুসঙ্গ মনে করেন। এ কারনেই তাঁর গানে আমরা আকুলতা খোঁজে পাই। বিচ্ছেদের আকুলতায় হৃদয়কে বিক্ষত করেন তিনি। না পাওয়ার যে বেদনার অনুরণন আমরা তাঁর মাঝে লক্ষ্য করি, সেটা পরম আরাধ্যের জন্যে। এ কারনে লোকগানের অন্যসব আঙ্গিকের চেয়ে বিচ্ছেদাঙ্গিকে গান গাইতে ভালো লাগে তাঁর। এ ধারার গান সকল শ্রেণীর মানুষকেই আবিষ্ট করে এবং দেশের সর্বত্রই গাওয়া যায়।

লাভলী দেবের কাছ থেকেই সার্বজনীনতার আখ্যান শোনা যাক- ‘দিন তারিখ মনে নেই। একটি এনজিও গান গাওয়ার জন্য জয়পুর হাট নিয়ে গেলো আমাকে। অচেনা মানুষ, অজানা পরিবেশ। মাঠভর্তি ¯্রােতা। আমি যে ধারার গান গাই অর্থাৎ লোকগান কি ভালো লাগবে তাদের, এমন শঙ্কা ছিলো মনে। যখন গাইতে শুরু করলাম সব শঙ্কা উবে গেলো। মন্ত্রমুগ্ধের মতো মানুষ ডুবে রইলো গানে। একটানা দেড়ঘন্টা গাইলাম। তারপর শুরু হলো অনুরোধ পর্ব। অনুধাবন করলাম, লোকগানই বাংলার প্রাণ। প্রথবারের মতো সিলেটের বাইরে সফল এই অনুষ্ঠান করে বুঝতে পারলাম, ভালো গান মানুষ সত্যিই ভালোবাসে।’

সুর পিয়াসী মন
গীতিকার গান লিখেন। সুরকার দেন সুর। সংগীতায়োজন করেন পরিচালক। যন্ত্রসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা তখনই স্বার্থক হয় যখন শিল্পীর কন্ঠে সেটি হয়ে উঠে শ্র“তিমধুর। এপর্যন্ত লাভলী দেব যত গান গেয়েছেন সবগুলোই তাঁর কন্ঠযাদুর কল্যানে দেশ বিদেশে হয়েছে জনপ্রিয়। তারমধ্যে উলে­খযোগ্যগুলো হচ্ছে, রাধারমন দত্তের ‘জলের ঘাটে দেইখ্যা আইলাম, কি সুন্দরও শ্যামরায়’, ‘কুঞ্জের মাঝে কে গো রাই আর, কুঞ্জের মাঝে কে’, জলে গিয়াছিলাম সই’, কৃষ্ণ কোথায় পাইগো সখি’, হাসন রাজার ‘নেশা লাগিলরে’, ‘রূপ দেখিলাম রে নয়নে’, ‘মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে’, ‘গুড্ডি উড়াইল’ শাহ আবদুল করিমের, ‘তুমি বিনে আকুল পরাণ’, কোন মেস্তরী নাও বানাইছে’, ‘প্রাণ নাথ ছাড়িয়া যাইনা মোরে’, বিজয় পাগলার ‘জানিতে চাই দয়াল তোমার আসল….’ প্রভৃতি।

শুধু উলি­খিত গীতিকবিদের গানই নয়, দুর্বিণশাহ, দীনহীন, শেখভানু, আরকুম শাহ, গিয়াস উদ্দিন আহমদ, একে আনাম প্রমুখের গান তাঁর মোহনীয় সুরের মুর্ছনায় ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। বেশকিছু মৌলিক গানও করেছেন তিনি। এরমধ্যে জাহাঙ্গীর রানার ‘আমার প্রাণবন্ধু বিহনে’ এবং রাজন সাহার ‘পাখি আমার মন বুঝেনা’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আরও কিছু মৌলিক গান করার পরিকল্পনা রয়েছে লাভলী দেবের। তারমতে, ‘মৌলিকগানের মধ্যেই বেঁচে থাকেন প্রকৃত শিল্পী। তাই শিল্পীমাত্রেই মৌলিকগান করা খুবই জরুরী!’
শুধু গানের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি লাভলী দেব। সুরও করেছেন অসংখ্য গানে। ‘পতিত পাবন হরি’ ক্যাসেটের সবগুলো গানের সুরই তাঁর করা। সুরের ভুবনেও তিনি অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে, সবকিছুকে ছাপিয়ে নিজেকে একজন লোকগানের শিল্পী পরিচয় দিতেই সচ্ছন্দ বোধ করেন তিনি।

কূল হারা কলঙ্কিনী, অমলীন স্মৃতি
বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে অনেক স্মৃতি লাভলী দেবের। অসংখ্য অনুষ্ঠানে করিম সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। তবে বিশেষ একটি স্মৃতি অমলীন হয়ে আছে তাঁর মানষপটে। সিলেট শহরের শিবগঞ্জের মিলফা কমিউনিটি সেন্টারে শাহ আবদুল করিমকে সম্মাননা প্রদানের আয়োজন করা হয়। সেখানে তাঁর লেখা গান গাওয়ার জন্য লাভলী দেবকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁকে দেখে খুবই খুশি হন আবদুল করিম। বলেন, ‘তুমি আইছো খুব বালা অইছে। তিনি লাভলীকে নাতিনী সম্বোধন করতেন। লাভলী দেব তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করেন, ‘করিম ভাই কোন গান গাইবো আজ। আপনার পছন্দের গান গাইতে চাই। তিনি বললেন, ‘তুমি জিতা গাও, ওতাইতো বালা লাগে।’ লাভলী বললেন, ‘তারপরও আমার কাছ থেকে আপনার লেখা কোন গানটি শোনার ইচ্ছে করছে। যদি বলতেন!’ তিনি তাঁকে ‘কূল হারা কলঙ্কিনী, আমারে কেউ ছইওনাগো সজনি’ গানটি গাওয়ার জন্য বললেন।’ লাভলী দেব মনপ্রাণ উজার করে গাইলেন! স্ট্যাজ থেকে নামার পর করিম ভাই তাকে কাছে ডেকে নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নাতনি আইজ বড় শান্তি পাইলাম। বড় বালা লাগছে। বড় বালা গাইছো।’

সেদিনের কথা মনে হলেই ভিন্ন এক অনুভূতি খেলা করে তাঁর মনে। বলেন, ‘যখন এই গানটি কোনও অনুষ্ঠানে গাই তখন শাহ আবদুল করিমের সেই কথাগুলো আমাকে স্মৃতিকাতর করে। মনে হয়, করিম দূর থেকে শুনছেন আর বলছেন ‘শান্তি পাইলাম!’ সেদিন তাঁর মনের মতো করে শোনাতে পেরেছিলাম বলে আজও একধরনের আত্মশ্লাঘা কাজ করে আমার মাঝে। যা আজীবন সুখস্মৃতি হিসেবে জাগরুক থাকবে মনোমাঝে।’

গানের প্রশ্নে আপোষহীন!
সিলেটে একটানা ১৮ বছর জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। ২০০৪ সালে সিলেটের পরিস্থিতি ছিলো ভিন্নরকম। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির তখন নাজুক অবস্থা। গ্রেনেড, বোমা বিস্ফোরনে প্রকম্পিত হচ্ছিল সিলেট। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে জন্মাষ্টমীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন আয়োজকরা। কারন কোনও শিল্পীই এই পরিস্থিতিতে ভয়ে গান গাইতে রাজী হচ্ছিলেন না। লাভলী দেবের কাছে আসতেই তিনি বললেন, কোনও চিন্তা নেই। আমি গাইবো। আপনারা আয়োজন করুন।

সংস্কৃতির প্রশ্নে আসলে লাভলী দেব ভয়ডরহীন। অসংখ্যবার হুমকি দেওয়া হয়েছে তাঁকে। কিন্তু কখনো দমে যাননি। গণজাগরণ মঞ্চের উত্তাল দিনগুলোতে যখন সন্তানদের নিয়ে প্রতিদিনই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নিতেন। উজ্জীবিত করতে গাইতেন দেশাত্ববোধক গান। তখন তাঁকে পরিবার সমেত হুমকি দেওয়া হয়। ফোনে এমন হুমকি পেয়ে লাভলী দেব যেনো আরো প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। একদিনের জন্যও বিরতি দিলেন না। দুই সন্তানকে নিয়ে অংশ নিলেন প্রতিটি কর্মসূচিতে। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিব্যক্তি, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের মর্মমূলে। আমার স্বামী দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। মামা শহীদ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি পরিণত বয়স থাকতো অবশ্যই আমি যুদ্ধে যেতাম। এ নিয়ে আমার আক্ষেপ আছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারার বেদনাকে প্রশমিত করতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই চলবে। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই আমাকে।’

ক্লান্তিহীন গানের পাখি!
গান, গান এবং গান। গান ছাড়া আর কোনও আরাধ্য নেই লাভলী দেবের। শাহ আবদুল করিমের লেখা ‘গানগাই আমার মনরে বোঝাই মন থাকে পাগলপারা আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া’- বিখ্যাত চয়নগুলো যেনও তাঁর চলার পথের পাথেয়। গানই তাঁর কাছে সবকিছু। কিবা দিন কিবা রাত্রি গানমগ্ন থাকেন সবসময়। হারমোনিয়াম তাঁর নিত্যসঙ্গী। সময়ের ফ্রেমে কখনও বাঁধতে চান না চর্চার সময়। যখনই ভালো লাগে, যখনই মন বলে তখনই শুরু করেন প্র্যাকটিস। মাঝরাতে ঘুম ভেঙেছে, একটা গান তোলা প্রয়োজন। বসে পড়লেন হারমোনিয়াম নিয়ে বিছানায়। শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিরতি নেই, ক্লান্তিও নেই। তবে এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কোনও অনুযোগ নেই তাঁর বিরুদ্ধে। উল্টো তাদের ভালোলাগার অন্যতম অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছে লাভলী দেবের গান। বিশেষ করে দীপক বাবুতো খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেন যখন, গান ধরেন লাভলী দেব। তার অভিব্যক্তি, ‘ভালো লাগে। আমার না গাইতে পারার আক্ষেপটা তখন অনেকটাই প্রশমিত হয়। আমি নিজেও সুর মিলাই তার সুরে।’

লাভলী দেবের সুর সাধনার এই নিবিষ্টতার মূলে রয়েছে বাবার অনুপ্রেরণা। তাঁর কাছ থেকে গানমগ্নতার যে পাঠ গ্রহন করেছিলেন শৈশবে সেটাই অন্তরকে বিকশিত করে চলেছে। একজন গানওয়ালা যেনও সদা জাগ্রত থাকেন লাভলী দেবের মনে। ধরতে গিয়েও তাঁকে ধরতে পারেন না। তিনি যেন শৈশবের দাদু বাবাজির মতো। যার স্মৃতি অহর্নিশ তাড়িত করে তাঁকে। সেই বৈষ্ণব দাদু খুব ভালো গান গাইতেন। সে কারনে শৈলেন্দ্র চন্দ্র রায়ের সঙ্গে খুব ভাব ছিলো তাঁর। তাঁর সঙ্গে গান আড্ডায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিলেও কোনও ক্লান্তি কিংবা অবসাদ আসতো না।

মন্দিরা বাজিয়ে তিনি যেসব ভক্তমূলক গান গাইতেন, সেগুলো নান্দনিকতার বিভা ছড়াতো। ‘দূর থেকে ভেসে আসার সুর শুনে আমরা বলে দিতে পারতাম বৈষ্ণব আসছেন। আমাদের বাড়ির দিকে যেদিন ভিক্ষে করতে আসতেন একটু আগে-ভাগেই রওয়ানা দিতেন তিনি। কারণ বাবার পালায় পরলে সন্ধ্যের পূর্বে যেতে পারতেন না ফিরে। দেহতত্ব, কীর্ত্তন, ভক্তিমূলক আর পদাবলী গাইতেন তিনি। ভীষণ ভালো ছিলো তাঁর গানের গলা। আজও কানে ভাসে তাঁর গানের সুর। তাঁর তিলক পড়া চেহারা যেনও সঙ্গোপনে বলে যায়, দিদি ভাই তুমি গেয়ে যাও।’ লাভলী দেব গেয়ে উঠেন, ‘আজ আমার বান্ধব কেহ নাই দয়াল গুরু তুমি বিহনে। আমার ডুবু ডুবু তরী ক্যামনে ধরি পাড়ি, আমার হালের বৈঠা খাইলো রে ঘুণে!’

এইযে সংযোগ, সেটাই লাভলী দেবের মননবিশ্বকে করছে পরিশীলিত। পদাবলী কীর্ত্তনের প্রতি তাঁর বিশেষ দূর্বলতার ভিত্তিও তৈরি হয়েছে এখান থেকেই। গানে প্রেমের রস আস্বাদনের যে স্পৃহা তাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে বাউলিয়ানার প্রতি। গানবাউল শব্দটি তাঁর নামের সঙ্গে তাই আমরা যুক্ত করতে পারি অবলীলায়। সেই যাত্রাই তিনি চালিয়ে যেতে চান শেষ দিন পর্যন্ত।

বেদনা থেকেই এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
সাফল্যের পেছনেও বেদনার অনুরণন থাকে। থাকে কষ্টগাথার আখ্যান। লাভলী দেবের সাফল্যের পেছনেও তেমনই এক দুঃখগাথা লুকিয়ে আছে। যদিও সেটা সমায়িক ছিলো, তারপরও সেই ঘটনাটিই অনেকখানি ভূমিকা রেখেছে আজকের লাভলী দেব তৈরিতে। সন্তান হিসেবে তাঁর জন্য সেই ঘটনাটি ছিলো সত্যিই বেদনার। কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছে শুনে তার পিতা শৈলেন্দ্র চন্দ্র রায় অভিমানে তাকে তাৎক্ষনিক দেখতে না আসার কথা বোধ হওয়ার পর যেদিন প্রথম জানতে পারলেন লাভলী সেদিন বিক্ষত হয়েছিলো তাঁর হৃদয়। সেদিনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এমন কিছু করতে হবে যাতে বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়। ছেলে আর মেয়ের মধ্যে যে কোনও পার্থক্য নেই তা যেনও বুঝতে পারেন তিনি।

লাভলী দেবের জন্মের সময়ে শোষণ-বঞ্চনার যাতাকলে পিষ্ট ছিলো প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবার। তাই ছেলে সন্তানই প্রার্থিত ছিলো প্রতিটি পরিবারে। কন্যা সন্তানকে দেখা হতো ‘বোঝা’ হিসেবে! কিন্তু দায় মনে করা সেই মেয়ে সন্তানই পিতার জীবদ্দশায় প্রমাণ করলেন তিনি ‘বোঝা’ নন, সম্পদ এবং সেটা শুধু পরিবারের নন, গোটা দেশের। মৃত্যুশয্যায় তাই বাবা বললেন, মা-রে তোর জন্য আমার গর্ব হয়। জন্মসূত্রে তুই আমার মেয়ে কিন্তু তুই এই দেশের সম্পদ।’ এরদুই দিন পর একটি অনুষ্ঠান ছিলো বৈশাখি টিভিতে। সেটি জানতেন শৈলেন্দ্র রায়। তিনি লাভলী দেবকে বললেন, ‘আমার যদি কিছু হয়ে যায় তুই কিন্তু প্রোগ্রাম বাদ দিবি না। অবশ্যই গাইতে হবে তোকে।’ বাবাকে কথা দিয়ে লাভলী দেব

বলেছিলেন তুমিতো কোথাও যাচ্ছনা। তাহলে এমন করে বলছো কেন? বাবার মুখে তখন হাসি থাকলেও চোখের কোনে চিক চিক করছিলো অশ্র“। এটাই জন্মদাতার সঙ্গে লাভলী দেবের ছিলো শেষ সাক্ষাৎ। এর পরদিনই পৃথিবীকে বিদায় জানান তিনি। এই পরিস্থিতিতে মেয়ে কি করে গাইবে গান, তাও আবার টিভিতে? বেকে বসলেন লাভলী, মাকে বললেন আমার দ্বারা হবেনা। মা প্রতিশ্র“তির কথা স¥রণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুই গান না গাইলে তোর বাবার আত্মা কষ্ট পাবে।’ বেদনা মনে নিয়েই ঢাকায় গেলেন লাভলী দেব। ঔইদিন টানা আড়াই ঘন্টা বৈশাখি টিভিতে গাইলেন মাটি ও মানুষের গান। সেদিন একটিবারের জন্যও লাভলী দেবের মনে হয়নি বাবা নেই। মনে হয়েছে সামনের সারিতে বসে তিনি গান শুনছেন আর বাহবা দিচ্ছেন মেয়েকে। বলছেন, দারুন গেয়েছিস এই গানটা!

জাত শিল্পীরা এমনই হন। বেদনাকেও তারা জয় করতে পারেন গান গেয়ে। লাভলীও পারলেন। গানে গানেই তিনি চিরবিদায় জানালেন জন্মদাতাকে।

স্নেহধন্যা
ভালোবাসা আর অকৃত্রিম স্নেহে মানুষকে অগ্রগামী করতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরন লাভলী দেব। বিশেষ করে পরিবারের নারী সদস্যদের জন্য বাধা-বিপত্তি পদে পদে থাকলেও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমই বলা যায় তাকে। পিতার পরিবারে যেমন, শ্বশুড়বাড়িতেও তেমনই স্নেহ মায়া মমতায় ঋদ্ধ হয়েছেন তিনি। যার ফলে তাঁর এগিয়ে যাওয়াটা ছিলো শুধু সময়ের ব্যাপার।

তাঁর মুখ থেকেই শোনা যাক, ভালোবাসাময় দুটি পরিবারের আখ্যান। ‘আমি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি। কারন এক জীবনে দুইমায়ের স্নেহ প্রাপ্তি সবার ভাগ্যে জুটেনা। কিন্তু আমি সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আমার দুই মা। একজন গর্ভধারিনী অন্যজন শ্বাশুড়ি। জন্মদাত্রির মতোই বিয়ের পর আমার শ্বাশুড়ি আমাকে আগলে রেখেছিলেন তাঁর স্নেহের পরশে। অন্যদিকে বাবাকে ছেড়ে আসলেও আমার শ্বশুড় কখনও বুঝতে দেননি বাবা ও তাঁরমধ্যে পার্থক্য। আমার প্রতিটি আবদার তিনি রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। আমাকে কখনও তিনি ছেলের বউ ভাবেন নি, ভেবেছেন মেয়ে। তিনি আমার কাছে পিতা এবং বন্ধু দুই-ই ছিলেন। তাঁর সঙ্গে অভাব-অভিযোগ, মান-অভিমান সব শেয়ার করতে পারতাম। আমি কখনও তাঁর কথার অবাধ্য হইনি। দুই বাবা যখন চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে পারি জমালেন, তখন বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিতে শুরু করলেন দীপক দেব। আমার প্রতিটি কর্মের দোসর তিনি। তাঁর মতো সহযাত্রী পেয়েছি বলেই আমি আজ এত দূরের পথ পারি দিতে সক্ষম হয়েছি। আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে দেব বাবুর বিরুদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ আছে কিনা আমি একবাক্যে বলবো ‘না’। আমার জীবন সঙ্গীনি বলে বলছিনা, তার বাবুর মতো মানুষ হয়না। সারা রাত প্রোগ্রাম করে এসে না ঘুমিয়ে তিনি ঠিকই গেছেন অফিস করতে। এটা শুধু একদিন বা দুই দিন নয়। দিনের পর দিন এমনটি হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিরক্ত হননি তিনি কখনো।

এই যে আকুন্ঠ সমর্থন সেটা না পেলে কখনোই আমি এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। পরিবারের কেউই কিন্তু আমার গানের পথে অন্তরায় হয়নি। সবাই সহযোগিতা করেছে। বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠান হলেও গানের জন্য ছাড় পেয়েছি। মেয়েরাও কখনো বিরক্ত করেনি। এইযে সকলের সহযোগিতা সেটাই কিন্তু চলার পথের পাথেয় হয়েছে। অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে অগ্রসর হতে। আমি মনে করি আমার পরিবারের সকল সদস্যের আকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি বলেই আজ লাভলী দেব বলে সবাই আমাকে চিনে। অন্যথায় আমি আর দশটা গৃহবধূর মতোই গৃহিনী হতাম, গানটা হতো না আমার দ্বারা।’

গানে এগিয়ে এ্যালবামে পিছিয়ে
তিন দশকের পথচলায় লাভলী দেব সিলেট অঞ্চলে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন যে, তাঁকে ছাড়া বড় কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চিন্তাই করতে পারেন না আয়োজকরা। শুধু সিলেট বিভাগেই নয়, দেশজুড়েই এখন ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন তিনি। যুক্তরাজ্য, ভারতের মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি। প্রতিবছর দেড়শ থেকে দুইশ অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশেন করে চলেছেন লাভলী দেব। এ পর্যন্ত কম করে হলেও পাঁচ হাজার অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি। অংশ নিয়েছেন দেশের প্রথম সারির প্রায় সবকটি টিভি চ্যানেলের লাইভ শোতে। গানে গানে মুগ্ধ করেছেন তিনি স্রোতাদের মন।

তবে সংগীতে এগিয়ে থাকলেও গানের এ্যালবাম বের করার ক্ষেত্রে লাভলী দেব অনেকটাই পিছিয়ে। এ পর্যন্ত মাত্র দুইটি একক এলবাম বের হয়েছে তাঁর। মিক্সড এ্যালবাম করেছেন ৩ টি। প্রথম একক লালনগীতির একক এলবাম ‘ঘরের চাবি’ বের হয় ২০০১ সালে। ইমন অডিও কমপ্লেক্স বের করে এটি। ১৯৯৮ সালে বাজারে আসে নবীন সিদ্দিকীর লেখা ‘পরান পাখি’। গীতের কলি থেকে বের হয় এটি।

প্রথম মিক্সড এ্যালবাম ‘সিলেটের বিয়ের গান’ বের হয় ১৯৯৯ সালে। ‘এমন মজা হয়না’ শিরোনামে দ্বিতীয় এ্যালবামটি আসে ২০০০ সালে। আর সর্বশেষ দ্বৈত এ্যালবাম ‘পতিত পাবন হরি’ বের হয় ২০১৬ সালে। এ্যালবামটির সবকটি গানের সুর করেছেন তিনি নিজেই। লাভলী দেবের প্রতিটি এ্যালবামই হয়েছে শ্রোতা প্রিয়। তারপওর প্রকাশনার এক্ষেত্রে কেনও পিছিয়ে এমন প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দেন লাভলী দেব, ‘আসলে করা হয়ে উঠেনি, অন্যকোনও কারনে নয়।’ তবে, নিজের সংগ্রহে থাকা গানগুলোকে রেকর্ডের পরিকল্পনা রয়েছে লাভলী দেবের। কথা ও সুর অবিকৃত রেখে কাজটি করতে চান তিনি।

পীড়া দেয় বিকৃতি!
লোকগানের বিকৃতি বেদনাহত করে লাভলী দেবকে। সকলে নয়, কেউ কেউ এই বিকৃতি করছেন, দাবি তাঁর। বাউল শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সইগো বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলে গন্ধ আমার বাড়ি আসে।’ গানটির কথা উলে­খ করে তিনি বলেন, স্ট্যাজ প্রোগ্রাম করতে গিয়ে অনেক সময় শোনা যায় যার উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান ‘বন্ধুর’ স্থানে তাঁর নামটি সংযোজন করে গীত হচ্ছে। তারপর ভাবের ক্ষেত্রেও তারতম্য হচ্ছে। উপস্থাপন সমস্যায় বিষাদের গান পরিণত হচ্ছে আনন্দের গানে। সেইসঙ্গে রুচিহীন অঙ্গভঙ্গিতো রয়েছেই। সস্তা জনপ্রিয়তার সন্ধান করতে গিয়েই ‘লোকগানের প্রকৃতভাবটা নষ্ট করে ফেলছেন কেউ কেউ। আমি এটাকে গানের অঙ্গহানি বলি। এসব করে আসলে সাময়িক লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু বড় ক্ষতি হয়ে যায় গানের। লোকগানকে বাঁচাতে হলে এসব বিকৃতি রোধ করতে হবে। নইলে একদিন, লোকগান আর ব্যান্ডের গানের মধ্যে তফাত খুঁজে পাওয়া দুরহ হবে।

অনেকে আধুনিক প্রযুক্তিকে প্রকৃত সংগীত সাধনার ক্ষেত্রে অন্তরায় মনে করলেও লাভলী দেব তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে, ‘অনেক কিছুই সহজ করে দিয়েছে প্রযুক্তি। পছন্দের শিল্পীর একটি গান ইচ্ছে করলেই নেটে সার্চ দিয়ে শোনা যাচ্ছে এবং প্রয়োজনে কম্পেয়ারও করা যাচ্ছে। আগে সেটা সম্ভব ছিলো না। বেশিরভাগ ক্যাসেটই কোনও না কোনও উপলক্ষে বের হতো। একটি ক্যাসেট সংগ্রহ করতে যে সময় ও রিকশাভাড়া তখন ঠিক যত টাকা ব্যায় হতো তা ঐ ক্যাসেটের দামেরই সমান হয়ে যেতো তা। প্রকৃত সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আসলে এখন অনেকে গান শিখতে চায়না, মুখস্ত করতে চায়। এই মুখস্ত করতে গিয়েই বিপত্তি ঘটছে। ক্ষতি হচ্ছে গানের।’ সম্মিলিতভাবে বিকৃতিরোধে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে অভিমত তাঁর।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা
আসলে লাভলী দেব যে মানের ও মাপের শিল্পী সে তুলনায় তাঁর প্রাপ্তির খাতাটাকে শূণ্যই বলা চলে। লোকগানের মেধাবী এই শিল্পী এ ধারার সংগীতের প্রচারে ও প্রসারে যে ভূমিকা পালন করে চলেছেন তা এক কথায় তুলনাহীন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোনও স্বীকৃতি আজও পাননি তিনি। তবে, এই না পাওয়া এনিয়ে তাঁর কোনও খেদ বা আক্ষেপ নেই। বললেন, ‘কিছু পাবার আশায় গান করিনা। আমি মানুষের ভালোবাসা পেতে চাই। এটাই আমার কাছে বড়। মানুষ ভালোবাসে বলেই গান করি।’

তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেলে কি হবে জনমানুষের ভালোবাসায় এ অঞ্চলের শিল্পীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর অবস্থান শীর্ষে। এপর্যন্ত তাঁর প্রাপ্তির খাতায় যেসব স্বীকৃতি ও সম্মাননা যুক্ত হয়েছে এরমধ্যে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ৮১ ও ৮২ সালে লোকসংগীতে প্রথম স্থান অর্জন, লন্ডন টাওয়ার হ্যামলেট সন্মাননা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সন্মাননা, নাট্যমঞ্চ সন্মাননা, লোকভারতী সম্মাননা, দুরবিন শাহ সন্মাননা, লোকউৎসব সন্মননা (২০১৫), লোকমঞ্চ সন্মান অন্যতম।

প্রান্তে অবস্থান করার কারনেই যোগ্য সম্মান পাননি তিনি, এমন অভিযোগ তাঁর অনুসারিদের। তাদের বক্তব্য, লাভলী দেব যদি রাজধানীতে অবস্থান করতেন, গড্ডালিকায় গা ভাসাতেন তাহলে পারি দিতে পারতেন অনেক দূরের পথ!

গানেই খোঁজেন মনের মানুষ!
প্রয়াত শিল্পী কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য্যরে সঙ্গে তাঁর ছিলো গভীর সখ্যতা। সম্পর্কটা এমন ছিলো যে যখনই সিলেট অঞ্চলের কোনও গানের কলি ভুলে যেতেন কালিকা কিংবা নতুন কোনও গানের প্রয়োজন হতো অবলীলায় ফোন করতেন লাভলী দেবকে। তিনি খুশি মনে তাঁর অসংখ্য আবদার রক্ষা করেছেন গান দিয়ে, তথ্য দিয়ে। একজন শিল্পীর অন্য শিল্পীকে এভাবে সাহায্য করার ঔদার্য্য আজকের দিনে তেমন একটা প্রত্যক্ষ করা না গেলেও লাভলী দেবের মাঝে সেটা অতীতে যেমন ক্রিয়াশীল ছিল, বর্তমানেও আছে। অন্যেকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা প্রোথিত রয়েছে তাঁর মর্মমূলে।

একটা উদাহরণ দিলেই পরিস্কার হয়ে যাবে মানবিকতা তাঁর মধ্যে কতোটা ক্রিয়াশীল। এ বছর পহেলা বৈশাখের একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত শিল্পী ছিলেন তিনি। কিন্তু অনুষ্ঠানে নবীন শিল্পীদের সুযোগ দিতে পরিবেশন করেন মাত্র একটি গান। এবং সেটা গান শেষে উলে­খ করেন তিনি। এইযে, ছাড়- এটা অনেক বড় ব্যাপার। ক’জন শিল্পীর এমন হিম্মত আছে মাঠ এভাবে, নতুনদের হাতে মাইক্রোফোন দিয়ে স্ট্যাজ ত্যাগের? তেমন একটা নেই। কিন্তু লাভলী দেব পারেন। আর পারেন বলেই লোকসংগীতের ভূবনে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছেন তিনি!

শুধু ঔদার্য্যইে নয়, সংগীত পরিবেশনের ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য। একটি গানকে যথাযথভাবে পরিবেশনের জন্য যতটা পরিশ্রম করা প্রয়োজন, তাঁর সবটুকুই তিনি করেন মনপ্রাণ উজার করে। এতে তাঁর কোনও ক্লান্তি বা অবসাদ নেই। পারফেক্ট না হওয়া পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এইযে লেগে থাকা, যথাযথভাবে আঙ্গিক ঠিক রেখে উপস্থাপনের আকুলতা, এটাই লাভলী দেবকে স্বাতন্ত্রতায় ভাস্মর করেছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় দু’চোখ দুঃখ বন্ধ করে তিনি সংগীত পরিবেশন করছেন। গানের সঙ্গে নিবির সংযুক্তির জন্যই এমনটি করে থাকেন তিনি। কথা ও সুরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে, যথার্থতার সন্ধানে তিনি এতটাই নিবিষ্ট হন যে, তাতে করে ভাবের ক্ষেত্রে যেমন তারতম্য হয়না, তেমনই শব্দপ্রয়োগ এবং সুর সংযোজনেও লক্ষ্য করা যায় মৌলিকতা। তাই তাঁর গান সরাসরি পৌছে যায় হৃদমাঝারে। আবেগ আর অনুভূতির অনন্য সংমিশ্রনে কথা ও সুরের যুগলবন্দি তৈরি করে দ্যুতনা। যা শুধু আমাদেরকেই নয়, অন্যভাষাভাষি মানুষকেও করে আবিষ্ট। প্রনিধানযোগ্য হিসেবে এখানে দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। প্রথমটি লন্ডনের, দ্বিতীয়টি ঢাকার।

২০০৪ সালে টাওয়ার হ্যামলেটের আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্য গিয়েছিলেন তিনি। সে সময় আয়োজকদের অনুরোধে দুর্বিনশাহর গান নিয়ে একটি কর্মশালায় মুখ্য আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন তিনি। অংশগ্রহনকারীদের অনেকেই ছিলো ভিন্নভাষি। তারা গানের মানুষকে যথারীতি গান শোনানোর অনুরোধ করেন। তিনি ভাবেন, অন্যভাষার মানুষ বাংলার লোকগান শুনে কি মুগ্ধ হবে? আমি কি তাদের মুগ্ধ করতে পারবো? ওরাতো ভাষাই বুঝবে না! কি করবো? এমন ভাবনা চিন্তার মাঝেই শুরু ককরলেন ‘ আমি জন্মে জন্মে অপরাধী তোমারই চরণেরে, আমারে নি আছে তোমার মনে’ গান দিয়ে। একে একে পরিবেশন করলেন ১০টি গান। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর সুরের মায়া আছন্ন করে রাখে সবাইকে। অংশগ্রহণকারীরা জানালেন, কথা না বুঝলেও স্রেফ সুর দিয়েই তিনি জয় করেছেন সকলের মন। গানের সুর মন ছুয়েছে সবার! একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে ঢাকায় সার্কভুক্ত দেশসমূহের গভর্ণরদের সম্মানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।

ড. আতিয়ার রহমান তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। রাষ্ট্রীয় সেই অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। লাভলী দেব যখন গান শুরু করবেন তখন মঞ্চে উঠেন আতিউর রহমান। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সমবেতদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা হয়তো তাঁর গানের ভাষা নাও বুঝতে পারেন। কিন্তু তাঁর দরদী সুরের ভাষা ঠিকই বুঝবেন। যা সবাইকে আন্দোলিত করবে, মহাবিষ্ট করবে।’ হলোও তাই। গান শেষে আমন্ত্রিত অতিথিদের ভূয়সী প্রশংসায় আপ্লুত হন লাভলী দেব। এমন অনেক উদাহরণ জমা আছে তাঁর গান যাত্রার পথে পথে। যা তাঁর গানপিয়াসী মনকে দিয়ে চলেছে সঠিক পথের দিশা। এনিয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘গান গেয়ে যদি মনটাই জয় না করা যায়, এমন গান গেয়ে কি হবে। মনমন্দিরের মহাজনকে খুশি করতে না পারলে আরাধনাটাইতো বৃথা হয়ে যায়!’ এমন প্রত্যয়ি উচ্চারণই শিল্পী হিসেবে লাভলী দেবের জাত চেনাতে আমাদের সাহায্য করে। অনুরণন তুলে মনে।

শেষ কথা
অনেকেই গান গায়, কিন্তু সবাই শিল্পী হতে পারে না। আসলে শিল্পী হওয়া যায়না! শিল্পী হয়েই জন্ম নেন গানের ভূবনের বাসিন্দারা। লাভলী দেবেরও জন্ম হয়েছে শিল্পী হিসেবেই। তাইতো তাঁর জীবনের পুরোটা জুরেই রয়েছে সংগীতময়তা। আরাধনাই তাঁকে আসীন করেছে অনন্য উচ্চতায়। মানুষের ভালোবাসার কারনে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা বিশেষন। তাঁর গান যেমন মুগ্ধতা ছড়ায়, তেমনই তৈরি করে ভাবাবেগ। অনুরণন তুলে মনে। বেদনাহত হৃদয়কে দেয় শান্তির পরশ। আনন্দকে করে তুলে উপভোগ্য, সঙ্গ দেয় নিঃসঙ্গতায়। কথা ও সুরের অপূর্ব সংমিশ্রণ দ্যোতনা তৈরি করে। তাঁর দরদী কণ্ঠ লোকগানের প্রতি উদ্ধুদ্ধ করে মানুষকে। ‘কলিজাতে দাগ লেগেছে, হাজারে হাজার, আমার ভালোবাসার ময়না পাখি, এখন জানি কার।’ গলা ছেড়ে যখন তিনি গেয়ে উঠেন তখন সত্যি সত্যিই দাগ লাগে কলিজাতে। সেই দাগ সহজে মুছা যায়না। এখানেই শিল্পী হিসেবে লাভলী দেবের স্বার্থকতা।

এন এইচ, ২৯ এপ্রিল





web hit counter